এই ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিলেন মরহুম গাহের আলী মন্ডল:
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কাতিলা এলাকার ঐতিহ্যবাহী নাগা বাজার শুধু একটি বাজারের নাম নয়, এটি একটি সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস। এই ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিলেন মরহুম গাহের আলী মন্ডল—একজন সাধারণ মানুষ, যিনি অসাধারণ ধৈর্য ও পরিশ্রম দিয়ে একটি জনপদের বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। “পরিচিতি পর্ব–১৩”-এ উঠে আসে তাঁর জীবনের শেষ ঈদের দিনটির হৃদয়স্পর্শী স্মৃতি।
ঈদের সকালটি ছিল কিছুটা নীরব ও ভারাক্রান্ত। চারদিকে ঈদের আনন্দ থাকলেও গাহের আলী মন্ডলের পরিবারের ভেতরে ছিল এক ধরনের অজানা শঙ্কা। তিনি তখন শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছিলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবুও পরিবারের সদস্যরা আশা হারাননি। কারণ এর আগেও অন্তত তিনবার তিনি গুরুতর অসুস্থতা কাটিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলেন। তাই সবাই মনে মনে বিশ্বাস করছিলেন—এবারও হয়তো তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।
ঈদের নামাজ শেষে তাঁর দুই ছেলে, মোঃ আব্দুল আলীম ও মোঃ গোলাম মোস্তফা, দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসেন। ঈদের আনন্দের চেয়ে তখন তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাবার পাশে থাকা। তারা দুজনই বাবার খুব কাছে বসে ছিলেন। গাহের আলী মন্ডল বিছানায় শুয়ে ছিলেন সম্পূর্ণ নীরব হয়ে। তাঁর চোখে ছিল গভীর ক্লান্তি, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি যেন তাঁকে কিছুটা শান্তি দিচ্ছিল।
বাড়ির চারদিকে ঈদের নানা আয়োজন ছিল। রান্নাঘরে তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের খাবার। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের আপ্যায়নের জন্য ছিল পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। কিন্তু পরিবারের সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল—এত খাবার থাকলেও গাহের আলী মন্ডলকে কিছুই ঠিকমতো খাওয়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। যিনি একসময় অতিথিদের আপ্যায়নে আনন্দ পেতেন, যিনি বাজারের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকতেন, সেই মানুষটি তখন নিজের খাবার গ্রহণ করতেও অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন।
ঈদের দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে শুরু করলে পরিবারের ছোট মেয়েটি তার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবাকে দেখতে চলে আসেন। বাবার অসুস্থতার খবর শুনে তাঁর মন অস্থির হয়ে উঠেছিল। বাড়িতে এসে বাবাকে নিস্তব্ধ অবস্থায় দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। অন্যদিকে বড় মেয়ে প্রায় প্রতিদিনই বাবার কাছে আসতেন, কারণ তাঁর বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রাম গোপীনাথপুরে। বাবার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ ছিল অত্যন্ত গভীর।
সেদিন পুরো বাড়ির প্রতিটি আয়োজন যেন একজন মানুষকে কেন্দ্র করেই ছিল—নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা গাহের আলী মন্ডলকে ঘিরে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বাজারের ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ দলে দলে তাঁকে দেখতে আসছিলেন। কেউ তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করছিলেন, কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। সকলের চোখে ছিল দুঃখ ও অনিশ্চয়তার ছাপ। কারণ তারা জানতেন, এই মানুষটি শুধু একটি পরিবারের অভিভাবক নন, তিনি ছিলেন পুরো নাগা বাজার এলাকার একটি প্রেরণার নাম।
গাহের আলী মন্ডল ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দূরদর্শী একজন মানুষ। বহু বছর আগে যখন এলাকায় একটি স্থায়ী বাজারের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল, তখন তিনিই উদ্যোগ নিয়ে নাগা বাজার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। নানা বাধা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েও তিনি থেমে যাননি। ধীরে ধীরে তাঁর প্রচেষ্টা বাস্তবে রূপ নেয়। আজকের নাগা বাজার সেই স্বপ্ন ও পরিশ্রমেরই ফল।
তাঁর জীবনের শেষ সময়েও পরিবারের সদস্যরা তাঁর স্বপ্ন ভুলে যাননি। বিশেষ করে তাঁর দুই ছেলে, মোঃ আব্দুল আলীম ও মোঃ গোলাম মোস্তফা, বাবার আদর্শ ও স্বপ্নকে সামনে রেখে ভবিষ্যতে নাগা বাজারের উন্নয়নে কাজ করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, একজন মানুষ চলে গেলেও তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শ বেঁচে থাকতে পারে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে।
২৪ মার্চ ২০২৬, বিকেল ৩টা ২০ মিনিট। সময়টি ছিল নাগা বাজারের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক মুহূর্ত। এই সময়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গাহের আলী মন্ডল। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বাজারের দোকানপাটে নেমে আসে শোকের ছায়া। মানুষ বুঝতে পারে, তারা শুধু একজন মানুষকে হারায়নি—হারিয়েছে একজন অভিভাবক, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা এবং একজন সংগ্রামী ব্যক্তিত্বকে।
তাঁর মৃত্যু নাগা বাজার সম্প্রদায়ের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকবে। কারণ এমন মানুষ বারবার জন্ম নেয় না। তিনি নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে এলাকার উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মানুষের কল্যাণে কাজ করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য।
তবে তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর স্বপ্ন থেমে থাকবে না। তাঁর সন্তানরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, নাগা বাজারকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে তারা বাবার স্বপ্ন পূরণ করবেন। গাহের আলী মন্ডলের অনুপস্থিতি কখনো পূরণ হওয়ার নয়, কিন্তু তাঁর আদর্শ, পরিশ্রম এবং স্বপ্ন নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
আজও যখন মানুষ নাগা বাজার -এ আসে, তখন অনেকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মরহুম গাহের আলী মন্ডলকে। কারণ তিনি প্রমাণ করে গেছেন—একজন মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও সততা একটি পুরো জনপদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাঁর স্মৃতি, তাঁর অবদান এবং তাঁর স্বপ্ন নাগা বাজারের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
Top of Form
Bottom of Form
সৌজন্যে,
নাগা বাজার,কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী।
Naga Bazar Mulivita Road
https://maps.app.goo.gl/KbQ5vnkDak4n9X7h9
Naga Bazar Bridge
https://maps.app.goo.gl/KNrpArb4iDANEUWS9
Naga Bazar Birkutsha Road
https://maps.app.goo.gl/yUXnEnSAmaSZ9dfH9
Naga Medha Bikash Coaching Centre
https://maps.app.goo.gl/cv4pKavne1pNAK5X9
Messar’s Mokseda Pharmacy
https://maps.app.goo.gl/KjyjsjHEJoCc3Qjf7
Messar’s D.K. pharmacy
https://maps.app.goo.gl/gugD3mRGRS1PsaQB8

