প্যাম্পাস (ডায়াপার) ব্যবহার : তার জীবনের এক নতুন এবং অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার একটি সুপরিচিত নাম—নাগা বাজার। আর এই বাজারের পেছনে যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, দূরদৃষ্টি ও আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে, তিনি হলেন নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম গাহের আলী মন্ডল। একজন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনকারী মানুষ হয়েও তিনি সমাজে ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত, সম্মানিত এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব।
গাহের আলী মন্ডল ছিলেন সহজ-সরল স্বভাবের মানুষ। তার জীবনধারা ছিল একেবারেই সাধারণ, কিন্তু চিন্তা-চেতনা ছিল অসাধারণ। তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষের কল্যাণে কাজ করাই জীবনের আসল উদ্দেশ্য। তিনি কখনো নিজের জন্য বড় কিছু ভাবেননি, বরং সবসময় সমাজের উন্নয়ন ও মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য চিন্তা করেছেন। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তার ছিল সহজ ও আন্তরিক সম্পর্ক। ধনী-গরিব, ছোট-বড়—সবাই তাকে ভালোবাসতো এবং শ্রদ্ধা করতো।
তার একটি বিশেষ গুণ ছিল—উচ্চপদস্থ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক। তিনি সেই সম্পর্কগুলোকে কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেননি; বরং এলাকার উন্নয়ন এবং মানুষের উপকারে লাগিয়েছেন। এই দূরদৃষ্টি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই ১৯৯০-এর দশক থেকে তিনি একটি স্থানীয় বাজার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একটি সুসংগঠিত বাজার গড়ে উঠলে স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং এলাকার অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, সংগ্রাম এবং পরিকল্পনার পর অবশেষে তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়। ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় “নাগা বাজার”। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সমাজের গণ্যমান্য মানুষ এবং বিপুল সংখ্যক সাধারণ জনগণ। এটি শুধু একটি বাজারের উদ্বোধন ছিল না, বরং ছিল একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন। নাগা বাজার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন, যা আজ একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বাগমারা উপজেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাকে কঠিন সময়ের সম্মুখীন হতে হয়। ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ হঠাৎ করেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শয্যাশায়ী হন। ১৮ মার্চ তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়—তিনি শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছিলেন এবং মুখে খাবার গ্রহণ করতে পারছিলেন না। দিন যত গড়াতে থাকে, তার শারীরিক দুর্বলতা তত বাড়তে থাকে। পরিবারের সদস্যরা গভীর উদ্বেগে পড়ে যান।
তার বড় ছেলে মোঃ আব্দুল আলীম একজন ফার্মাসিস্ট হিসেবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন বাবাকে সুস্থ করে তুলতে। তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করেন এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পরিবারের সবাই আশা করেছিলেন, আগের মতোই তিনি আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন। আল্লাহর রহমতে ২০ মার্চ তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়, যা পরিবারকে নতুন করে আশাবাদী করে তোলে।
এদিকে ঈদের সময় ঘনিয়ে আসছিল। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন সবাই ঈদের উপলক্ষে একত্রিত হন এবং একই সাথে গাহের আলী মন্ডলকে দেখতে আসেন। এটি যেন এক অদ্ভুত আবেগঘন মুহূর্তে পরিণত হয়—সবাই একত্রিত, কিন্তু অন্তরে ছিল শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা।
অসুস্থতার কারণে এক সময় তাকে প্যাম্পাস (ডায়াপার) ব্যবহার করতে হয়, যা ছিল তার জীবনের এক নতুন এবং অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। তিনি এতে মানসিকভাবে অস্বস্তি বোধ করতেন, কিন্তু শারীরিক অসহায়ত্বের কারণে এটি ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই কষ্টগুলো তাকে নীরবে সহ্য করতে হয়েছে।
অবশেষে ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ, বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে তিনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরবিদায় নেন। তার মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। একজন সৎ, কর্মঠ এবং মানবিক মানুষকে হারিয়ে সমাজ গভীরভাবে শোকাহত হয়।
গাহের আলী মন্ডলের সবচেয়ে বড় অবদান হলো নাগা বাজার প্রতিষ্ঠা। এই বাজার আজ শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। অসংখ্য মানুষ এখানে কাজ করছে, জীবিকা নির্বাহ করছে এবং নিজেদের জীবনমান উন্নত করছে। তার এই অবদান চিরদিন মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।
তবে তার স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি আরও অনেক কিছু করতে চেয়েছিলেন—এলাকার উন্নয়ন, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তোলা ছিল তার লক্ষ্য। যদিও তিনি সবকিছু সম্পন্ন করে যেতে পারেননি, কিন্তু তার রেখে যাওয়া পথনির্দেশনা এবং আদর্শ আজও জীবন্ত।
তার দুই ছেলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ—তারা তাদের বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ করবেন। নাগা বাজারকে আরও উন্নত এবং সম্প্রসারিত করার জন্য তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা বিশ্বাস করেন, তাদের বাবার দেখানো পথ অনুসরণ করেই তারা সফল হতে পারবেন।
গাহের আলী মন্ডল আমাদের মাঝে আর নেই, কিন্তু তার কর্ম, আদর্শ এবং অবদান চিরকাল বেঁচে থাকবে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—একজন সাধারণ মানুষও অসাধারণ কিছু করতে পারেন, যদি তার মধ্যে থাকে ইচ্ছাশক্তি, সততা এবং মানুষের জন্য কিছু করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন—আমিন।
সৌজন্যে,
নাগা বাজার,কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী।
Naga Bazar Mulivita road
https://maps.app.goo.gl/Vr39JGHhgm7yMzgs5
Naga Shopping and Service Centre
https://maps.app.goo.gl/RBAPZzCusf5yNHzD8
Naga Bazar Bridge
https://maps.app.goo.gl/BFrM3J5N9L2MTpbBA
Naga Bazar Birkutsha Road
https://maps.app.goo.gl/UJ8Yn2t8DmJRe1tE6
Naga Bazar Health Centre
Diaper

