মৃত্যুভয় ধীরে ধীরে তাঁকে আরও দুর্বল করে তুলছিল:
২১/০৩/২০২৬। ঈদের দিন শেষ হয়ে গেছে। চারদিকে এক ধরনের নীরবতা নেমে এসেছে। দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে রাতের অন্ধকার যেন পুরো বাড়িটিকে ঘিরে ফেলেছে। অথচ সেই রাতটি ছিল নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম গাহের আলী মন্ডলের জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাতগুলোর একটি।
তিনি তখন শারীরিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ। দীর্ঘদিন ধরে হাঁপানি রোগে ভুগছিলেন। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল খুব বেশি। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন তাঁর শরীরের উপর এক বিশাল চাপ হয়ে উঠেছিল। তিনি বিছানায় শুয়ে ছিলেন নিঃশব্দে। কিন্তু তাঁর বুকের ভেতরের শ্বাসের শব্দ সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তিনি কতটা কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
তাঁর বড় ছেলে মোঃ আব্দুল আলীম সেই সময় বাবার পাশেই ছিলেন। একজন সন্তানের দায়িত্ব, ভালোবাসা ও সেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তিনি বাবার পাশে থেকে সেবা করে গেছেন। সেই রাতেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য বাবাকে একা ছেড়ে যাননি।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাহের আলী মন্ডলের শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায়। রাত প্রায় ২টার দিকে মোঃ আব্দুল আলিম বুঝতে পারেন, তাঁর বাবার শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। তিনি বাবার সঙ্গে কথা বলছিলেন বারবার। গাহের আলী মন্ডলও কিছু কথা বলছিলেন। কিছু কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, আবার কিছু কথা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল দুর্বলতার কারণে।
হঠাৎ তিনি চা খেতে চান। কিন্তু খালি পেটে চা খাওয়া ঠিক হবে না ভেবে তাঁর ছেলে তাঁকে বিস্কুট দেন। কিন্তু গাহের আলী মন্ডল সেই বিস্কুট ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। সামান্য একটু কামড় দিয়ে আবার ফেলে দেন। তাঁর শরীর তখন এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করাও কষ্টকর হয়ে উঠেছিল।
মোঃ আব্দুল আলীম সারা রাত বাবার পাশে জেগে ছিলেন। তিনি বাবাকে চা দেননি, কারণ চা খেলে ঘুমের সমস্যা আরও বাড়তে পারত। অথচ সেই রাতেই গাহের আলী মন্ডল এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে পারেননি। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ জাগ্রত, উদ্বিগ্ন এবং ভীষণ দুর্বল।
রাতের গভীর নীরবতার মধ্যে তিনি বারবার কিছু মানুষের নাম ডাকছিলেন— মোস্তফা, ময়না, সামেনা, সুরজান এবং লতা। এরা সবাই কোনো না কোনো সময় তাঁর সেবায় জড়িত ছিলেন। অসুস্থতার সেই কঠিন মুহূর্তে হয়তো তাঁদের উপস্থিতি তিনি অনুভব করতে চেয়েছিলেন।
২২/০৩/২০২৬ তারিখের সেই রাতটি ছিল তাঁর জন্য এক ভয়ংকর মানসিক ও শারীরিক পরীক্ষার রাত। হয়তো তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর জীবনের সময় খুব বেশি বাকি নেই। মৃত্যুভয় ধীরে ধীরে তাঁকে আরও দুর্বল করে তুলছিল। কিন্তু এই ভয় ও কষ্টের মাঝেও তিনি তাঁর সন্তানদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা রেখে যেতে চেয়েছিলেন।
তিনি তাঁর ছেলেদের বলেছিলেন,
“কখনো বিশৃঙ্খলায় জড়াবে না। নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হবে না। ঐক্যই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। তোমরা যদি এক না থাকো, মানুষ সবসময় তোমাদের ঠকাবে।”
এই কথাগুলো ছিল একজন অভিজ্ঞ মানুষের জীবনের সারাংশ। তিনি নিজের জীবনে বহু মানুষ দেখেছেন, বহু প্রতারণা সহ্য করেছেন, বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। তাই জীবনের শেষ সময়ে তিনি তাঁর সন্তানদের জন্য রেখে গেলেন ঐক্যের শিক্ষা।
মরহুম গাহের আলী মন্ডল শুধু একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। ১৯৯০-এর দশক থেকে তিনি নাগা বাজার প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। সীমিত সামর্থ্য, কষ্ট এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তিনি হাল ছাড়েননি। অবশেষে ০৫/০১/২০২৪ তারিখে নাগা বাজার উদ্বোধনের মাধ্যমে তাঁর বহু বছরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর সরলতা। তিনি কখনো অহংকার করেননি। মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশতেন। এলাকার সাধারণ মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন তাঁর সততা, পরিশ্রম ও মানবিকতার জন্য।
২৪/০৩/২০২৬, বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার জন্য এক গভীর শোকের মুহূর্ত ছিল। নাগা বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আজও তাঁর দুই ছেলে তাঁর উপদেশগুলো ধরে রাখার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের বাবার শিক্ষা ও আদর্শই তাঁদের ভবিষ্যতের পথ দেখাবে।
মরহুম গাহের আলী মন্ডল হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, তাঁর পরিশ্রম এবং তাঁর ঐক্যের বাণী নাগা বাজারের ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
সৌজন্যে,
নাগা বাজার,কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী।
Naga Bazar Mulivita Road
https://maps.app.goo.gl/tFPVT8SKBuZzoNhY8
Naga Bazar Birkutsha Road
https://maps.app.goo.gl/vuQ2FcLeNyMvjXRw9
Naga Bazar Bridge
https://maps.app.goo.gl/kLrDrEJ4tAnPhk85A
Messar’s d.k. pharmacy
https://maps.app.goo.gl/fupERGVBf6YyuYKC9

