নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা গাহের আলী মন্ডল: জীবনসংগ্রামের শেষ অধ্যায় (Introduction Part 10)
মানুষের জীবনের শেষ সময়গুলো কখনো কখনো তার পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম গাহের আলী মন্ডলের জীবনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও অসুস্থ একজন মানুষ, কিন্তু মানসিকভাবে তিনি ছিলেন অবিচল, স্বপ্নে পরিপূর্ণ এবং আপনজনদের প্রতি গভীর মমতায় ভরা।
২০২৬ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ১৭ মার্চ তিনি সম্পূর্ণরূপে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। পরদিন ১৮ মার্চ থেকে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল এবং তিনি মুখে কোনো খাবার গ্রহণ করতে পারছিলেন না। প্রতিটি দিন যেন তাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছিল। তার বড় ছেলে মোঃ আব্দুল আলীম, যিনি একজন ফার্মাসিস্ট, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলেন বাবার যত্ন নেওয়ার জন্য। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সকলেই বুঝতে পারছিলেন—সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
গাহের আলী মন্ডলের বড় ছেলের পরিবার কর্মসূত্রে গাজীপুরে বসবাস করতেন। এই দূরত্ব তার হৃদয়ে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছিল। তিনি প্রায়ই তার বড় ছেলেকে জিজ্ঞেস করতেন তার আদরের নাতি মোঃ শাদমান শাবাবের কথা। আট বছর বয়সী, তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র শাবাব তখন তার মামার বাড়ি, নাটোর জেলার নলডাঙ্গার মহিষডাঙ্গায় অবস্থান করছিল। প্রতিবারই আব্দুল আলীম তাকে আশ্বস্ত করতেন—“শাবাব খুব শিগগিরই আসবে, আপনার সাথে দেখা করবে।” এই আশ্বাস গহের আলী মন্ডলের হৃদয়ে কিছুটা প্রশান্তি এনে দিত, কিন্তু তার অন্তরের গভীরে তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, হয়তো সময় আর খুব বেশি নেই।
নিজের প্রিয় মানুষদের শেষবারের মতো দেখার আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল। বারবার তিনি সবার খোঁজ নিচ্ছিলেন, যেন এক ঝলক দেখেই তার মন পূর্ণ হয়ে যায়। এই দৃশ্য তার বড় ছেলের জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একদিকে বাবার অবনতিশীল শারীরিক অবস্থা, অন্যদিকে তার শেষ ইচ্ছাগুলো পূরণ করার তাগিদ—সব মিলিয়ে এক গভীর মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটছিল তার।
এমন সময় ঈদের ছুটি এসে উপস্থিত হয়। এই ছুটির কারণে পরিবারের প্রায় সবাই একত্রিত হতে পেরেছিলেন, যা ছিল এক অর্থে সৌভাগ্যের বিষয়। কারণ জীবনের এই শেষ মুহূর্তগুলোতে প্রিয়জনদের পাশে পাওয়া সত্যিই এক বিরল আশীর্বাদ। পরিবারের সবাই এসে তাকে ঘিরে রাখলেন, তার সেবা-যত্নে কোনো কমতি রাখলেন না।
অবশেষে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্তটি এলো, যখন তার নাতি শাদমান শাবাব তার সামনে উপস্থিত হলো। ছোট্ট এই ছেলেটি তার দাদার সঙ্গে কথা বলছিল, আর গহের আলী মন্ডলও যেন তার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে নাতির সাথে কথা বলছিলেন। এটি ছিল তাদের শেষ আলাপচারিতা। শাবাব হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারছিল না মৃত্যুর গভীরতা, কিন্তু সে অনুভব করছিল—সে তার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে হারাতে চলেছে। পরবর্তীতে সে প্রায়ই তার বাবা-মায়ের সাথে তার দাদার স্মৃতিচারণ করত, যা প্রমাণ করে এই সম্পর্কের গভীরতা।
এই কঠিন সময়টাতে বড় ছেলের স্ত্রী মোছাঃ শামীমা খাতুনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাড়িতে এসে শ্বশুরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তার আন্তরিকতা এবং দায়িত্ববোধ ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু তিনিও বুঝতে পারছিলেন, দিন দিন গহের আলী মন্ডলের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং তাকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে গাহের আলী মন্ডল হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন—তার সময় শেষের পথে। তবুও তার মনে ছিল এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের তৃপ্তি। ১৯৯০-এর দশক থেকেই তিনি একটি বাজার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন, যা এলাকার বেকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। দীর্ঘ প্রচেষ্টা এবং সংগ্রামের পর তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন। “নাগা বাজার” নামে সেই বাজারটি অবশেষে ০৫/০১/২০২৪ তারিখে উদ্বোধন করা হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ জনগণ।
এই বাজার শুধু একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র নয়, বরং এটি গাহের আলী মন্ডলের জীবনের পরিশ্রম, স্বপ্ন এবং সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতার প্রতীক। যদিও তিনি তার স্বপ্নকে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি, তবে তিনি এমন একটি ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন, যা ভবিষ্যতে আরও প্রসারিত হবে।
অবশেষে, ২৪ মার্চ ২০২৬, বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং পুরো এলাকার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার চলে যাওয়া যেন এক যুগের অবসান।
তবে তার রেখে যাওয়া স্বপ্ন এবং আদর্শ আজও বেঁচে আছে। তার দুই ছেলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ—তারা তাদের বাবার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করবেন এবং নাগা বাজারকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ বাজারে পরিণত করবেন। তারা জানেন, এটি শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বরং তাদের বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
গাহের আলী মন্ডলের জীবন আমাদের শেখায়—একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য তার কর্মে, তার স্বপ্নে এবং সমাজের জন্য তার অবদানে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, একজন সংগ্রামী এবং একজন স্নেহশীল মানুষ। তার এই অবদান এবং স্মৃতি চিরকাল মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
সৌজন্যে,
নাগা বাজার,কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী।
Naga Bazar
https://maps.app.goo.gl/gcNnoY972Dt9ZLmY8
Naga Vila
https://maps.app.goo.gl/ozSE2ToKip5N31u86
Naga Bazar Zero Point
https://maps.app.goo.gl/5m2KjBMLFb84oYGPA
Naga Shopping and service Centre
https://maps.app.goo.gl/25sz19HvQD1jduXo7
Naga Bazar Shopping Centre
https://maps.app.goo.gl/BXurGepmPjUS75HZ8
Naga Bazar Health Centre
https://studio.youtube.com/video/7RkbMOyUhDA/edit

